মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১২:৩১ অপরাহ্ন
নিজস্ব সংবাদদাতা: গৃহকর্মীদের সুরক্ষা দিতে প্রণয়ন করা হয় ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’। কিন্তু সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গৃহকর্মীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। এর বড় শিকার হচ্ছে শিশু গৃহকর্মীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আইনের দ্বারা একটি কর্মক্ষেত্রে কী কী সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে জানার অভাবে আইনটির সুফল পাচ্ছে না কেউই। ফলে আইনগত অধিকার বঞ্চিত এসব গৃহকর্মী শিশুরা এগিয়ে চলছে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
২০২২ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। রাজধানী বনানীর একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতো একটি শিশু। কাজে যোগদানের পর থেকেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন গৃহকর্ত্রী সামিনা আলম। এরপর কাজের ভুলত্রুটি খুঁজে শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। মেয়েটির চিৎকারের আওয়াজ যেন বাইরে না যায়, সেজন্য নির্যাতনের সময় তার মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে দেওয়া হতো। কখনও কখনও দুই হাতে সুপার গ্লু লাগিয়ে বেধড়ক পেটানো হতো তাকে।
অমানবিক এমন ঘটনার পর পুলিশ ভিকটিমকে উদ্ধার করলেও কোনও মামলা হয়নি। ফলে সহজেই বিচার থেকে ফসকে যান গৃহকর্ত্রী। আইনজীবীরা বলছেন, এভাবে বিচারহীনতার কারণে নির্যাতনের শিকার শিশুদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। লঙ্ঘিত হচ্ছে গৃহকর্মী শিশুদের আইনগত অধিকার।
ন্যাশনাল ডোমেস্টিক ওমেন ওয়ার্কার ইউনিয়নের (এনডিডাব্লিউইউ) আইনজীবী জাহান আরা হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শুধু বনানীর ঘটনাই নয়। রাজধানীসহ এর বাইরেও অসংখ্য গৃহকর্মী শিশু প্রতিদিন অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক গৃহকর্মীরাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তবে শিশুরা তাদের থেকেও বেশি ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়। কোনও কারণে ভিকটিমের পরিবার মামলা না করলে রাষ্ট্র (পুলিশ) বাদি হয়ে মামলা করে এগিয়ে আসছে না। তাই গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত এসব শিশুরা তাদের আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্যাতনের পর অভিযুক্তরা দ্রুত ভিকটিমের পরিবারকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বা ক্ষতিপূরণের বেশি টাকা দেওয়ার কথা বলে মামলা থেকে বেঁচে যায়। তবে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ জরুরি। নয়তো এই শিশুরা একটি অসুস্থ ভবিষ্যতের দিতে এগিয়ে যাবে।’
গৃহকর্মী শিশু নির্যাতনের একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকাসহ সারা দেশে যারা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন তাদের ৯০ ভাগেরও বেশি নারী। যাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা ১৮ বছরের নিচের বয়সী। তাদের জরিপ দেখা গেছে, গৃহকর্মীদের মধ্যে যারা হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয় তাদের অধিকাংশের বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তারপরেই রয়েছে সাত থেকে ১২ বছরের শিশুরা।
গৃহকর্মী শিশু নির্যাতনের শিকার হলে আইনি প্রতিকার চাওয়ার বিষয়ে ‘পরিবারের সচেতনতার অভাব ও এগিয়ে না আসা’কে প্রতিবন্ধকতা মনে করছেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানও।
গৃহকর্মী শিশুদের আরেকটি চিত্র তুলে ধরে ‘ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স: ডিভ্যালুয়েশন অ্যান্ড ডিসক্রিমিনেশন’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘সারা দেশের ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী দৈনিক ৯ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাজ করে। তাদের মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু গৃহকর্মীর কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমাই নেই। অথচ একজন শিশু গৃহকর্মী মাসে গড়ে ১ হাজার ১৮৫ টাকা মজুরি পায়। আবার কেউ কেউ তাও পায় না। এমনকি তাদের ঠিকমতো খাবার ও পোশাক বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়।‘
শিশুসহ সকল গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০১৫ সালে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি প্রণয়ন করে সরকার। ওই নীতিমালায় নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ৭ (১০) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- (ক) কোনোক্রমেই গৃহকর্মীর প্রতি কোনও প্রকার অশালীন আচরণ অথবা দৈহিক আঘাত অথবা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। গৃহকর্মীর উপর কোনোরকম হয়রানি ও নির্যাতনের ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারের উপর বর্তাবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ও সুস্পষ্ট নির্দেশাবলি প্রদান করবে; (খ) নিয়োগকারী, তার পরিবারের সদস্য বা আগত অতিথিদের দ্বারা কোনও গৃহকর্মী কোনও প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যেমন- অশ্লীল আচরণ, যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতন কিংবা শারীরিক আঘাত অথবা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; (গ) গৃহকর্মী নির্যাতন বা হয়রানির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানা যেন দ্রুত ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাপ্তরিক নির্দেশনা জারি করবে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় গৃহকর্মীর প্রতি নির্যাতনের প্রতিকারে প্রয়োজনে আন্তমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে সরকারের কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে পারবে; (ঘ) গৃহকর্মী কর্তৃক দায়েরকৃত যৌন হয়রানি ও যৌন নির্যাতন কিংবা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের মামলা সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত হবে। যৌন হয়রানি বা যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের গাইড লাইন প্রযোজ্য হবে; এবং (ছ) নীতিতে যাই থাকুক না কেন গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে কোন বাধা কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না।
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের যুগ্ম সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল মনে করেন, ‘যারা আইন প্রণয়নে যুক্ত, তারাই ব্যক্তিগত জীবনের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে আইন প্রণয়ন করে থাকেন। তাই আমাদের একটি সুবিবেচনা সম্পন্ন এবং ব্যক্তি স্বার্থহীন আইন প্রয়োজন। আইন না হওয়া পর্যন্ত শুধু নীতিমালা দিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না। শ্রম আইনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু আইন শৃঙ্খলাবাহিনী আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ততটা তৎপর থাকে না। আবার বড় কোনও ঘটনা না ঘটলে রাষ্ট্রও শ্রমিক নির্যাতনের বিষয়টি বড় করে দেখে না। তাই নীতিমালাটিকে আইনে রূপান্তর করা এবং সে পর্যন্ত পুলিশকে আইন প্রয়োগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিকারের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জাহান আরা হক বলেন, ‘মামলা করতে ভিকটিমের পরিবারের এগিয়ে না এলে পুলিশ তো নিজেরাই বাদি হয়ে মামলা করতে পারে। আইনেও সে সুযোগ রয়েছে। ফলে নির্যাতনকারীদের মনে ভীতি তৈরি হবে এবং নির্যাতনও কমে আসবে। এছাড়াও আইনি সুরক্ষার বিষয়টি গৃহকর্মী বা মালিকপক্ষের অনেকেই জানে না। এজন্য জাতীয়ভাবে প্রচারণা বৃদ্ধি করারও প্রয়োজনীয়তা দেখছি।’
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের যুগ্ম সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল বলেন, ‘যেহেতু নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার অসহায় থাকে সেহেতু পুলিশের এগিয়ে আসা জরুরি। নীতিমালাটি সম্পর্কে অনেকেই জানে না বলে সুবিধা নিতে পারে না। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রচারেরও অভাব রয়েছে। জাতীয়ভাবে গণমাধ্যমে নিয়মিত বিজ্ঞাপন প্রচার করলে এ বিষয়ে গৃহকর্মী শিশু বা সংশ্লিষ্ট সকলের মনস্তাত্ত্বিক একটি আস্থার জায়গা তৈরি হতো, তারা তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হতে পারতো। এতে নির্যাতনকারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও ভীতি তৈরি হতো।’
গৃহকর্মী শিশুদের নির্যাতন রোধে ক্ষতিগ্রস্তের পরিবারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের দেশে বেশিরভাগ গৃহকর্মীদের মধ্যে বিশেষ করে শিশুরা কোনও নির্যাতনের শিকার হলে তাদের পরিবার বিষয়টি নিয়ে অনেকটা চেপে যান। প্রকাশ করতে চান না, বিভিন্ন কারণে আইনের আশ্রয় নিতে চান না।
যার কারণে তাদের ওপর নির্যাতনকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। যেহেতু ভুক্তভোগী গৃহকর্মী শিশু বা তার পরিবারের থেকে প্রকাশ না করলে বাসায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে নির্যাতনকারীদের বিচার করার মতো অবস্থায় এখনও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। সেহেতু আমি মনে করি ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার থেকেই এ বিষয়ে এগিয়ে আসা উচিৎ।
একইসঙ্গে শিশুসহ সকল ধরনের গৃহকর্মীদের শ্রম আইনে যুক্ত করার বিষয়ে একটি মূল কমিটি ও একটি সাব কমিটি কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। সেসব কমিটি তাদের পর্যালোচনা শেষে এবং বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবেন। যার ধারাবাহিকতায় দ্রুত সময়ের মধ্যে গৃহকর্মীদের শ্রম আইনে যুক্ত করা সম্ভবপর হবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী।